গৌতম ভট্টাচার্য্য / গাভাসকার-মিয়াঁদাদ থেকে টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপ

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল চলছিল তখন সাদাম্পটনে। স্পষ্টবক্তা ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অধিনায়ক কেভিন পিয়েটারসেন বৃষ্টিবিঘ্নিত সেই ফাইনালের সময়ই দাবি তুলেছিলেন ভবিষ্যতে এই ম্যাচের কেন্দ্র যেন দুবাই-ই হয়।

কেন দুবাই আদর্শ বোঝাতে ‘কেপি’ যা বলেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায় – ‘‘নিরপেক্ষ স্থান, দুর্দান্ত স্টেডিয়াম, আবহাওয়ার দিক দিয়ে নিশ্চয়তা (বৃষ্টি হবে না), অনুশীলনের সুবন্দোবস্ত এবং অবশ্যই ঘোরার আদর্শ জায়গাও। আর হ্যাঁ, স্টেডিয়ামের পাশেই তো আইসিসি-র সদর দফতরও!’

সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) এখনও আইসিসি-র অ্যাসোসিয়েট মেম্বার। কিন্তু পিয়েটারসেনের মন্তব্যেই পরিষ্কার, গত দুই দশকের ক্রিকেটে নিরপেক্ষ কেন্দ্র হিসাবে কতটা উঠে এসেছে এবং ভরসা অর্জন করেছে সংগঠকদের পাশাপাশি ক্রিকেটার এবং দর্শকদেরও। তাই, ৫০ বছর আগে তৈরি হওয়া দেশ যখন টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিল, অবাক হওয়ার কোনও কারণ ছিল না।

অতিমারীর কারণে ভারত নিজের দেশের বদলে দুবাইতে বিশ্বকাপ আয়োজনে আগ্রহী হয়েছিল। আসলে দুবাই, আবু ধাবি এবং শারজার তিনটি আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে। তার ঠিক আগে হয়েছিল আইপিএল-এর শেষাংশও। অর্থাৎ, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত, দুমাস জুড়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের টিটোয়েন্টি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন ইউএই-র ক্রিকেটপ্রেমীরা। কোভিড ১৯ দ্বিতীয়বার ছড়িয়ে পড়ায় আইপিএল মাঝপথে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল সৌরভ গাঙ্গুলির বিসিসিআই। দেশের মাঠে আয়োজনে নানা অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে ঠিক করা হয়, দ্বিতীয় পর্ব হবে মরুশহরে। আর সুবিধাও হবে ঠিক তারপরই বিশ্বকাপ থাকায়। আইপিএল খেলে সরাসরি ক্রিকেটাররা ঢুকে পড়তে পারবেন বিশ্বকাপের বৃত্তে। মাঝে পড়শি দেশ ওমানে অবশ্য খেলতে যেতে হয়েছিল কয়েকটি দেশের ক্রিকেটারদের, বাছাইপর্বের জন্য।

মরুদেশে ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা এমিরেটস ক্রিকেট বোর্ড-এর (ইসিবি) জন্য আরও ভাল খবর হল, দেশের সরকারের থেকে তারা ২০২৩-এর পর পুরুষদের আন্তর্জাতিক একদিনের ক্রিকেট এবং টিটোয়েন্টি প্রতিযোগিতা আয়োজনের ব্যাপারে ছাড়পত্র পেয়ে গিয়েছে, আরও ১৬টি দেশের মতোই। মোট আটটি প্রতিযোগিতা হবে ২০২৩-এর পর। পুরুষদের দুটি ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ, পুরুষদের চারটি টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং পুরুষদেরই দুটি আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি হবে ২০২৪ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে। সম্ভাব্য আয়োজক হিসাবে আইসিসি সদস্য দেশগুলিকে প্রাথমিক পর্যায়ের পরিকল্পনা জানাতে বলেছিল আইসিসি।

এই পরিকল্পনায় দেশগুলি এককভাবে যেমন, দুটি বা তিনটি দেশ মিলেও আবেদন জানাতে পারত। যে দেশগুলি আবেদন জানিয়েছিল – অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড, ভারত, আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নামিবিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওমান, পাকিস্তান, স্কটল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইউএই, ইউএসএ এবং জিম্বাবোয়ে। ক্রিকেটে বড় শক্তির দেশগুলি তো থাকলই, এবারের আইপিএল এবং টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপের সফল আয়োজনের কারণে এই তালিকায় ইউএই-র নামটাও বিরাটভাবে উঠে আসবে এবার। তাই ভবিষ্যতে এই আট প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি বা দুটির আয়োজক হওয়ার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে, স্বাভাবিক।

আইসিসি-র কার্যনির্বাহী চিফ একজিকিউটিভ জিওফ অ্যালারডাইস বলেছিলেন, ‘বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটের প্রায় একশো কোটি ভক্ত। আর আইসিসি প্রতিযোগিতার আয়োজক দেশ হলে সামাজিক এবং আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হওয়া সম্ভব, সবাই জানেন। এই ধরনের আইসিসি প্রতিযোগিতায় স্থানীয় মানুষ সুযোগ পান বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে হাত হাত মিলিয়ে কাজ করার পাশাপাশি ভিন্ন দেশের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতিকে চেনার, যা দেশের সার্বিক উন্নতিতেও প্রভাব ফেলে।’

ইউএই-ও তাই সংগঠক হওয়ার দিক দিয়ে আরও বড় হয়ে ওঠার এই সুযোগটা হাতছাড়া করেনি। এত দিন পর্যন্ত ক্রিকেটে ইউএই-র ভূমিকা ছিল কৃতজ্ঞ সহযোগীর। পাকিস্তানে কোনও দেশ ক্রিকেট খেলতে যেতে আগ্রহী নয়, তাই পাকিস্তান ‘হোম’ ম্যাচ খেলবে ইউএই-তে, পাকিস্তানের সুপার লিগও আয়োজিত হবে মরুদেশেই। আইপিএল হয়েছে, ২০১৮ সালে এশিয়া কাপও হয়েছিল, কারণ ভারত ও পাকিস্তানের নিরপেক্ষ দেশে খেলা না হলে পরস্পরের মুখোমুখি হওয়া সমস্যা। গত দশ বছর ধরেই চলছিল এমন। এবার ইউএই স্বাধীনভাবে নিজেদের দাবি পেশ করতে পারবে।

গত বছর, ২০২০ সালে, প্রবল অতিমারীর মধ্যেও যখন আইপিএল আয়োজিত হয়েছিল মরুশহরে, ভারতের তখনকার কোচ রবি শাস্ত্রী কিন্তু দেখতে পেয়েছিলেন ভবিষ্যৎ। নিরপেক্ষ কেন্দ্র হিসাবে বরাবরই শাস্ত্রী ইউএই-র বড় সমর্থক। বলেছিলেন, ‘২০১৪ সালে আইপিএল হয়েছিল এখানে। তখনই বলেছিলাম যে, আইপিএল যদি বিদেশে আয়োজন করতে হয়, ইউএই-ই সবচেয়ে ভাল। দুর্দান্ত পরিকাঠামো আর বহু অনাবাসী ভারতীয় এখানে — এই দুটিই সবচেয়ে বড় কারণ। আর, কোভিড মহামারীর এই ঘন কালো দিনে ইউএই ছাড়া আর কোনও দেশ সুষ্ঠুভাবে আইপিএল-এর আয়োজন করতে পারত না। সব ঠিকঠাক থাকলে ভবিষ্যতে আইসিসি প্রতিযোগিতার আয়োজক হিসাবেও দেখা যেতেই পারে মররুদেশকে।’

২০২০-র আইপিএল হয়েছিল বিনা সমস্যায়। ইসিবি তারপরই বিসিসিআই-এর সঙ্গে একটি মউ-ও স্বাক্ষর করেছে যেখানে বলা আছে যে, বিসিসিআই-এর যে কোনও বড় প্রতিযোগিতা আয়োজনের ব্যাপারে সার্বিক সাহায্য করতে ইসিবি তৈরি থাকবে।

মরুশহর ছিল শারজা। ক্রিকেট একসময় বিরাট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল সেখানে। আবদুল রহমান বুখাতির আর তাঁর ‘ক্রিকেটারস বেনেভোলেন্ট ফান্ড সিরিজ’ (সিবিএফএস) জনপ্রিয়তায় আকাশ ছুঁয়েছিল আটের দশকের শুরুর দিকে। কারা খেলেননি তখন?

সুনীল গাভাসকার থেকে ইমরান খান, কপিলদেব থেকে ওয়াসিম আক্রাম, ভারত-পাকিস্তান লড়াই অন্যমাত্রা পেয়েছিল সিবিএফএস-এর আমলে। চেতন শর্মার সেই ম্যাচের শেষ বলে জাভেদ মিয়াঁদাদের ছক্কা মেরে জেতানো মনে পড়ে? কিংবা, ইমরানের ১৪ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ভারতকে ১২৫ রানে শেষ করে দেওয়ার পর ব্যাটে-বলে কপিল এবং গাভাসকারের চার ক্যাচ নিয়ে পাকিস্তান ইনিংস ৮৭ রানে মুড়িয়ে দেওয়ায় সক্রিয় সাহায্য? এই সবই তো শারজায়! শচীনের মরুঝড়, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে, ভুলতে পারবেন? প্রায় চল্লিশ বছর লাগল ইউএই-র, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাধীন আয়োজক হিসাবে উঠে আসতে। ক্রিকেটের পরিভাষায় তাই বলাই যেতে পারে, ভিতটা শক্ত হয়েছে, বড় ইনিংসের পথে এখন মরুদেশের ক্রিকেট!

Leave a Reply

Your email address will not be published.