জয় গোস্বামী / যোগ্যতম

বিরাশি-তিরাশির পাকিস্তান-ভারত তৃতীয় টেস্ট। আগের টেস্টে ইনিংস ও ৩৬ রানে হেরেছে ভারত। পরের টেস্টে আবার ইনিংস ও ১১৯ রানে হারবে। এই তিন নম্বর টেস্টে ভারত আগে ব্যাট করতে নেমে ২২ রানে তিনটে উইকেট হারিয়েছে। চতুর্ছ উইকেট ৮২-তে গেল। আমি একটা সাদা-কালো টিভির সামনে বসে আছি। আমাদের নিজেদের বাড়িতে টিভি ছিল না তখন। ঠিক পাশেই বাবু-মিলুদের বাড়ি। ওদের ঘরে বসে-বসে খেলা দেখতাম। একাই। আমি গেলেই বাবুর মা টিভি চালিয়ে দিতেন। মাসিমা এতদিন ছিলেন। রানাঘাট গেলে দেখা হত। এবারের শীতে চলে গেলেন। আমি সারাদিন বসে থাকতাম টিভির সামনে। মাসিমা চা দিয়েছেন। বিরতির সময়, দুজন কমেন্টেটর, একটি বিশেষ বল বারবার রিপ্লে করে দেখাচ্ছিলেন। এবং তাই নিয়ে কথা বলছিলেন। কমেন্টেটর দুজনের একজনের নাম আসিফ ইকবাল, অন্যজন এক্সপার্ট হিসেবে আছেন বক্সে — মনসুর আলি খান পতৌদি। যে-ডেলিভারির রিপ্লে তাঁরা বারবার দেখাচ্ছেন, সেই বলটি কোনও উইকেট নিতে পেরেছিল? না, তা পারেনি। বোলারের নাম কী? সরফরাজ নওয়াজ। সরফরাজের একটি দেরিতে-ভাঙা আউটগোয়িং বল তাঁরা দেখাচ্ছিলেন কেবল একটিই বিস্ময় থেকে, যে-বিস্ময় তাঁরা প্রকাশ করছিলেন বারবার। পতৌদি অল্পকথায়। আসিফ আবেগ বিহ্বল ভাবে। বিস্ময় ও রিপ্লে-র কারণ হল যিনি ব্যাট করছিলেন, তিনি কীভাবে এই বলটি থেকে ব্যাটটা সরিয়ে নিচ্ছেন। তিনটি স্লিপ লাফিয়ে উঠল উইকেটকিপার ওয়াসিম বারিসহ। কিন্তু এটাকে ‘বিট’ বলতে নারাজ ভারত ও পাকিস্তানের দুই প্রাক্তন অধিনায়ক। আসিফ ইকবাল ও মনসুর আলি খান পতৌদির মতে — এটা জাজমেন্ট। ব্যাটসম্যানের দেওয়া জাজমেন্ট। আসিফ এটাও বলেছিলেন, ক্রিকেটের ছাত্রদের দেখা উচিত এই ব্যাট সরিয়ে নেওয়াটা। তখনকার দিনে, তিরিশ বছর আগে, বিজ্ঞাপন দেখাত, তবে এত বেশি দেখাত না। ফলে কেমেন্টেটর-রা বিরতিতে কথা বলার সুযোগ একটু বেশি পেতেন। ভারতের রান তখন ২ উইকেটে ১৭। যে-ব্যাটসম্যানের এই ব্যাট সরিয়ে নেওয়া দেখানো হচ্ছিল — তাঁর পরিণতি কী হল? তিনি দলের স্কোর উইকেটে ২২-এ দাঁড় করিয়ে ব্যক্তিগত ১২ রানে আউট হয়ে গেলেন ইমরানের বলে। সেই আউট হয়ে যাওয়াটা নিয়মমাফিক দু-তিনবার রিপ্লেতে দেখানো হয়েছে, ঠিকই। কিন্তু মারাত্মক ওই বলটি, ডেলিভারি-টি থেকে শেষ মুহূর্তে ব্যাট সরিয়ে নেওয়াটা বারবার দেখাচ্ছিলেন দুই প্রাক্তন অধিনায়ক। এই টেস্টে ভারত ২৭২-এ অল আউট হওয়ার পর, পাকিস্তান ৬৯২ রানের ইনিংস ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। তার মধ্যে চারজনের চারটে সেঞ্চুরি। যে-ব্যাটসম্যান প্রথম ইনিংসে ১২ করেছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে খেলার সময় তিনি ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান নবাগত মনিন্দর সিং-এর সাহায্যও পান ৩৮ মিনিট। মনিন্দরের অবদান ২। ৩ বলের জন্য দিলীপ দোশি এসে যখন চলে যাচ্ছেন, তখন ইনিংস শেষ হয়েছে বলেসেই ব্যাটসম্যানও ফিরছেন প্যাভিলিয়নের দিকে। ততক্ষণে উপর্যুপরি দুটি ইনিংস পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন দলকে, যদিও ১০ উইকেটে হার থেকে রক্ষা করতে পারবেন না। কারণ, আর মাত্র ৮ রান তোলার জন্য মাঠে নামবে পাকিস্তান। কিন্তু দ্বিতীয়বার যে ব্যাট করতে নামতে হল পাকিস্তানকে, সে কেবল এঁর জন্যই। ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসের প্রথম বল থেকে শেষ পর্যন্ত রয়ে গেলেন এই ব্যাটসম্যান। ৭ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। যাকে বলে ‘ক্যারিইং দ্য ব্যাট’। রান ১২৭। এই দাঁড়েয়ে থাকাটা আমি দু’দন ধরে দেখলাম। এটা হল সেই টেস্ট — যেখানে ইমরান খান প্রথম ইনিংসে ৯৮ রানে ৬টা উইকেট তুললেন, দ্বিতীয়বার ৮২ রানে ৫টা। ব্যাট হাতে ঝোড়ো  ১১৭ রানও করলেন ইমরান। এর ঠিক পরের টেস্টেই জাভেদ মিয়াঁদাদ-মুদাসসর নজর জুটি ৪৫১ রানের বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করবেন। দুজনেরই ডাবল হান্ড্রেড হয়ে গিয়েছে তখন। সেই কোন কালে ৬০ রানে ২ উইকেট পড়েছিল পাকিস্তানের, এখন তো দু’উইকেটে ৫১১। কারই বা তখন মনে থাকবে ’৩২ সালে করা ব্র্যাডম্যান-পন্সফোর্ড-এর কোনও উইকেট জুটির সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ছোঁয়া হয়ে গিয়েছে। ফলে নিতান্ত অন্যমনস্কতাবশতই আউট হলেন মুদাসসর ২৩১ রানে। মিয়াঁদাদ ২৮০ নট আউট রইলেন। ব্র্যাডম্যান-পন্সফোর্ডের বিশ্বরেকর্ড আর ভাঙল না। তারও ২৫ বছর আগে একবার এই রেকর্ডের থেকে পাঁচ রান দূরে এসে গিয়েছিল একটি জুটি। ৪৪৬ রানে যখন পার্টনারশিপ পৌঁছেছে, তখন কনরাড হান্ট রান আউট হয়ে যান পা পিছলে নিজস্ব ২৬০ রানে। তাঁর সঙ্গী অবশ্য নট আউটই থেকে গিয়েছিলেন ৩৬৫ করে। গ্যারি সোবার্স। যা হোক, ’৮২-’৮৩-র পাকিস্তান সফরে ইমরানের দলের সেই প্রবল পরাক্রমের মধ্যে ভারত চূড়ান্ত অপদস্থ হয়। বিশ্বনাথ একটা ৫৩ ছাড়া পুরো সিরিজে কিছু করতে পারেননি। দিলীপ দোশি এরপরই টেস্ট দল থেকে বাদ পড়েন। ওই ‘ক্যারিইং দ্য ব্যাট’ রেকর্ডবুক ছাড়া আর ক্রিকেট সাংবাদিকরা ছাড়া কারও-ই মনে থাকেনি। তবু, ওই ১২৭ নট আউট আমি দেখেছিলাম, যখন আমার জীবন নানা দুর্যোগের মধ্যে দিয়ে চলছিল। কিন্তু ওই দাঁড়িয়ে থাকাটা আমি ভুলতে পারিনি। কারণ, দুর্যোগের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার, উত্তেজিত না-হওয়ার একটা পাঠ যেন দিয়েছিল ওই ইনিংস। জীবনের পাঠ। ‘ক্যারিইং দ্য ব্যাট’ নয়, যেন ‘ক্যারিইং দ্য লাইফ’।

কিন্তু, তারই সঙ্গে সঙ্গে এটা বলা ভাল, আরও একটা জিনিস আমার মনে গেঁথে আছে। আসিফ ইকবাল ও পতৌদির বারবার দেখানো ওই রিপ্লে ও তৎসম্পর্কিত বিস্ময়। মনে আছে, ঠিক সময়ে সুনীল গাভাসকারের ওই ব্যাট সরিয়ে নেওয়াটা, যাতে তিনজন স্লিপ লাফিয়ে ওঠে উত্তেজনায়। মনে আছে, ওটা ছিল জাজমেন্ট। হ্যাঁ, জাজমেন্ট।

দুই

বল থেকে ব্যাট সরিয়ে নেওয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। সম্প্রতি, ভারতের যে-ব্যাটসম্যান, নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন টেস্ট ক্রিকেট থেকে, তাঁর নাম সবারই জানা, রাহুল দ্রাবিড়। এই রাহুল দ্রাবিড়-এর অবসর গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে, ভারতের ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করল বিশেষ এক ধরনের অ্যাটিচুড, বিশেষ এক ধরনের মনোভঙ্গি। ভারতের ক্রিকেটে চিরকালের জন্য না হলেও বহুকালের জন্য এই বিশেষ ধরনের ‘মন’-কে আর দেখা যাবে না এটুকু বলা যায়। অন্তত আমার জীবৎকালের মধ্যে ওই ধরনের ‘মনোভঙ্গি’ নিয়ে কোনও ব্যাটসম্যান উঠে আসছেন নবীন প্রজন্ম থেকে — এই সম্ভাবনা প্রায় নেই। কারণ ক্রিকেট-সমাজ প্রবলভাবে বদলে গিয়েছে।

‘মন’-এর কথা বললাম তো? কিন্তু সেই ‘মন’ ঠিক কী? সেই ‘মন’-এর ইতিহাস কোথায় খুঁজলে পাব? একটু-একটু ছুঁয়ে যাচ্ছি মাত্র। রাহুল দ্রাবিড়ের জন্মের আগে যাঁরা ক্রিকেট খেলেছেন, এমনকি অবসরও নিয়ে নিয়েছেন, তাঁদের দু-একজনের কথা বলি। কেন বলছি! কারণ, আমার কাছে, রাহুল দ্রাবিড় একটি ধারার প্রতিনিধিত্ব করলেন এতদিন। লেন হাটন, কলিন কাউড্রে, কেন ব্যারিংটন, হানিফ মহম্মদ, জিওফ বয়কট, সুনীল গাভাসকার। হ্যাঁ, এদের বেশির ভাগই ওপেনার। ঠিক, কিন্তু আমি বলতে চাইছি, এঁদের সবার ভেতরে, ঈষৎ কম-বেশি হলেও, অবস্থান করত সেই ‘মনোভঙ্গি’, যেটার নাম ‘সংকল্প’। ঠিক জেদ কথাটা বলতে চাইছি না। ‘জেদ’ জিনিসটার মধ্যে আছে একটা ‘গোঁ’। যেখানে বিচারশক্তির ভূমিকা কম। বা, প্রায় নেই। সেই জন্যই ‘জেদ’ জিনিসটার মধ্যে মানবস্বভাবের নেতিবাচক উপাদান মিশে থাকে। ‘জেদ’-এর প্রয়োগে যদি সে-মানুষ তার জীবনে যে কোনও ক্ষেত্রে সফল হয়ে যায় দৈবাৎ — তা হলে সেই ‘জেদ’ তা জীবন থেকে আর যায় না। কর্মজীবনে বাইরের সফলতা এলেও, মানুষ হিসেবে, অন্তর্জীবনে সে নেমে যেতে থাকে, কারণ, বিচারশক্তির প্রয়োগ তখন থাকে না। বা খুবই কমে যায়। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এই বিচারবুদ্ধি কমে যাওয়ার নানা দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি।

লেন হাটন যখন ব্যাট সরিয়ে রাখছেন, তখন আর কোনও টেস্ট ওপেনার-এর নামের পিছনে ১৯টা সেঞ্চুরি নেই। হাটনের অব্যবহিত ওপরে তখন হ্যামন্ড, তাঁর ২৩টা শতরান নিয়ে। এবং, না বললেও চলে, মাথার ওপর রয়েছেন রবি, ব্র্যাডম্যান, তাঁর ২৯টা শতরান নিয়ে। কাউড্রে যখন খেলা ছাড়ছেন, তখন সাড়ে ৭ হাজারের বেশি টেস্ট-রান তাঁর। সেই মুহূর্তে সর্বাধিক মোট টেস্ট-রান কাউড্রেরই। কেন ব্যারিংটনকে কেন আনছি এর মধ্যে? আমার ধারণায়, এই কেনেথ ফ্রাঙ্ক ব্যারিংটন কেবল একজন বড় ব্যাটসম্যানই নন, এই বিশেষ ‘মন’-টি তিনিও বহন করতেন, জেনে বা না-জেনে আরও অনেকের সঙ্গে তাঁরও উত্তরসাধক, আমাদের রাহুল দ্রাবিড়।

ব্যারিংটন ষাটের দশকের শেষ দিকে রিটায়ার করেন। তখন তাঁর টেস্ট রান ৬,৮০৬। সেঞ্চুরি ২০টা। ৩৫টি অর্ধশতক। ভাবুন, ষাটের দশকে। ক’টা টেস্ট খেলা হত তখন? অথবা হানিফ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৯ উইকেটে ৫৭৯ করে ডিক্লেয়ার করল। পাকিস্তান ১০৬ অল আউট। সর্বোচ্চ স্কোর উইকেটকিপার ইমতিয়াজ আহমেদ-এর। ২০। গিলক্রিস্ট ৩২ রানে ৪ উইকেট, আর পরবর্তীকালে গাড়ি দুর্ঘটনায় অকাল-মৃত কোলি স্মিথ ২৩ রানে ৩ উইকেট। সোবার্সকে বলই করতে হল না। আর সোবার্স তখন রীতিমতো জোরেই বল করতেন। পাকিস্তানকে ফলো-অন করতে হবে জানা কথা। করলও। ম্যাচও শেষ হয়ে যাবে শিগগিরই। কারণ স্বমহিমায় গিলক্রিস্ট রয়েছেন উল্টোদিকে।

সেই গিলক্রিস্টের অবস্থা কী দ্বিতীয় ইনিংস-এ? ৪১ ওভার বল করে ১২১ রানে এক উইকেট। তাঁর সঙ্গী অ্যাটকিনসন ১২৭ রানে এক উইকেট। সোবার্স ৬৭ ওভারে প্রায় ১০০ রান দিয়ে ১টা, আর স্মিথের অবস্থাও তাই। কারণ কী? কারণ ফলো-অন করে পাকিস্তান ৮ উইকেটে ৬৫৭ করে ডিক্লেয়ার করল যে! একজন ব্যাটসম্যান ওপেন করে পড়ে রইলেন ক্রিজে। হানিফ মহম্মদ। কতক্ষণ? ৯৭০ মিনিট। যদি আউট না হয়ে আর মোটামুটি ২৮ রান করতে পারতেন — তা হলে সোবার্সের আগেই হাটনের তিনশো চৌষট্টির রেকর্ড ভেঙে দিতেন হানিফ। ৩৩৭-এ আউট হলেন। ব্র্যাডম্যানের সর্বোচ্চ স্কোর-এর চেয়ে ৩ রান ওপরে। হ্যামন্ডের সর্বোচ্চের চেয়েও ১ রান বেশি।

কিন্তু, ব্র্যাডম্যান-হামন্ডের সঙ্গে হানিফের নাম কেউ একসঙ্গে বলবে? কোনও দিন বলবে না। কেন? ওই যে ‘মনোভঙ্গি’। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাস্ট বোলিং-এর বিরুদ্ধে ৭ ঘণ্টা ২৪ মিনিট উইকেট আঁকড়ে পড়ে থেকে রামচাঁদকে সঙ্গী করে টেস্ট বাঁচিয়েছিলেন একজন বাঙালিও। আমাদের পঙ্কজ রায়। ৯০ করেছিলেন তিনি।

ক্রিকেট কাদের সোনার আসনে বসিয়ে রাখে? যে কিনা ভিভ রিচার্ডস, যে কিনা গ্যারি সোবার্স, যে গুণ্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, যে জাহির আব্বাস। ভিক্টর ট্রাম্পার থেকে যে ধারার আরম্ভ মোটামুটি বলা যায়। তারপর ধরুন স্ট্যান ম্যাকেব। সোনালি-চুল ডেভিড গাওয়ার। ফ্র্যাঙ্ক ওরেল, গ্যারি সোবার্স, রোহন কানহাই, ব্রায়ান লারা। চির-রোমান্টিক আমাদের রাজপুত্র সৌরভ গাঙ্গুলি, আর অবশ্যই একের-পর-এক কিংবদন্তির সৃষ্টিকর্তা শচীন তেন্ডুলকারও।

কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ বলতে ডেসমন্ড হেইন্সকে কি মনে পড়বে আমার? পড়বে না। শতাধিক টেস্ট ওপেন করেছেন লোকটা। ৭ হাজারের ওপর রান। কিন্তু মনে পড়বে না। কারণ কী? ওই যে, মনের বিশেষ ধরন।

আচ্ছা, এই যে আমি এতক্ষণ ‘মন’ ‘মন’ বলছি, এটা কী করে বলছি? এঁদের সবার আত্মজীবনী কি পড়েছি আমি? না। পড়িনি। আত্মজীবনী আছে কিনা তা-ই জানি না। একটা মানুষের কাজের মধ্যেই তার ‘মন’-টা প্রকাশ পায়। আর সেই মনে যদি ‘সংকল্প’ থাকে — কাজের মধ্যে সেটাও প্রকাশ পাবে।

একটা গল্প বলি। এক নবীন স্পিনার জীবনের প্রথম ফার্স্টক্লাস ম্যাচ খেলতে নামলেন। পরবর্তী কালে ইনি ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের এক নম্বর স্পিনার হবেন। যাঁকে ব্র্যাডম্যানও সমীহ করেন। হেডলি ভেরিটি। প্রথমবার বল হাতে নিয়েই তরুণটি ২৬ রানে ৬ উইকেট ব্যাগে পুরলেন। ড্রেসিংরুমে ফিরে আসার পর সবাই পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে, হাত ঝাঁকাচ্ছে। ভেরিটি খুব আশা নিয়ে তাঁর দলের ক্যাপ্টেনের কাছে গেলেন। ক্যাপ্টেন তরুণ প্লেয়ারটিকে দেখামাত্র লাগালেন এক ধমক। তোমার চতুর্থ ওভারের দ্বিতীয় বলটা লেগস্টাম্পি শর্ট ফেলেছিলে। ব্যাটসম্যান ওটাতে বাউন্ডারি পায়। নইলে, তোমার ২২ রানে ৬ উইকেট হত। আরেকটু ইকনমিক হতে শেখো, বুঝলে!

এই ক্যাপ্টেনের নাম জ্যাক হবস। ভেরিটি পরবর্তী কালে স্মরণ করেছেন এই তিরস্কার তাঁর কাছে মূল্যবান হয়ে উঠেছিল। কারণ তার কয়েক বছরের মধ্যেই স্বয়ং ব্র্যাডম্যানকে প্রত্যেকটি টেস্টে বল করার অমানুষিক কাজ করতে হয়েছিল ভেরিটিকে। এই শি৭আ তখন কাজে লেগেছিল। কারণ পূর্ণশক্তির ব্র্যাডম্যানকেও মাঝেমাঝে আটকে দিতে পারতেন ভেরিটি।

পাঠকদের জানাই, ভেরিটি ও হবসের এই গল্পটি আমি পেয়েছিলাম ষাটের দশকের ক্রীড়া সাংবাদিক দিলীপ দত্ত-র বইতে। বইটির নাম আজ আর মনে নেই। এই গল্পটি হঠাৎ কেন বললাম, কারণটা বলি। বর্তমান ভারতীয় দলের একজন ব্যাটসম্যানের দুটি ট্রিপল হান্ড্রেড আছে। তারপর তিনি ২৮৪ নট আউট করে ফিরলেন। পরদিন সকালে আর ৯ রান যোগ করে ২৯৩ রানে আউট হয়ে হাসতে হাসতে ফিরে এলেন। হাসতে হাসতেই, কারণ, তিনি এর জন্য একটুও মনখারাপ করেননি। ওটাই তাঁর ধরন। আর ৭ রান করতে পারলে, টেস্টে তাঁর তিনটি ট্রিপল সেঞ্চুরি হত। যা আর কোউ করেননি। ফলে সেটা বিশ্বরেকর্ড হত। বিশ্বরেকর্ড তিনি অবহেলায় ছুড়ে ফে!তে পারেন। খেলার আনন্দের জন্যই তিনি খেলতে চান। সকলেই ধন্য-ধন্য করল। সবই ঠিক আছে। স্পোর্টিং স্পিরিট তো এরকমই হবে। এই তৃতীয় ট্রিপল সেঞ্চুরি যদি সেই ব্যাটসম্যান করতে পারতেন, তবে তা একটি বিশ্বরেকর্ড হত। সেই খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত বিশ্বরেকর্ড হত। তা তো বটেই।

কিন্তু সেই সঙ্গে, যে-দেশের হয়ে এই ব্যাটসম্যান ব্যাট করতে নামেন সেই দেশেরও হত রেকর্ডটি। একটি বিশ্বরেকর্ডের কীর্তি লাভ করত ভারতবর্ষ নামের একটি দেশও।

এই কথাটি, সেই খেলোয়াড়, অথবা আউট হওযার পর তাঁর ক্যাজুয়াল ডোন্ট-কেয়ার ভঙ্গির প্রশংসা যাঁরা করেছিলেন — তাঁরা কেউই মনে রাখেননি। একজন জ্যাক হবস দরকার ছিল এই ব্যাটসম্যানটিকে তিরস্কারের জন্য। যে, নিজের ইচ্ছেটাই সব নয়। নিজের টিমটাও একটা ব্যাপার। যে-টিমটা প্রতিনিধিত্ব করছে তোমার দেশের। ‘তোমার দেশ’ একটা ব্যাপার। আর এই জায়গাতেই আসে ‘মনোভঙ্গি’-র কথাটা। দীর্ঘ, দীর্ঘ সময় ব্যাট করার ধকল — টিমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পরেও সেই মানুষই নিতে পারে, যে কেবল ‘জেদ’-এর ওপর, মনের ওই মুহূর্তের চাওয়ার ওপর নির্ভর করে চলে না। সানি গাভাসকারের একটা ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন এমজে আকবর। তাতে গাভাসকার বলছেন, সমালোচকদের কথা আমি বিশেষ ভাবি না। এক-একটা লম্বা ইনিংসের পর যখন টেবিলে শুয়ে মাসাজ নিই, তখন ইনিংসের প্রত্যেকটা বল আমি মনে-মনে রিপ্লে করে দেখি। পুরো ইনিংসটার রিভিউ তখনই হয়ে যায়। সেই জন্যই আমার মনে হয় ডাবল হান্ড্রেডগুলো নয়। ম্যানচেস্টারের ৫৮-টাই আমার জীবনের সেরা ইনিংস। বলা দরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৯৬ রানের ইনিংস তখনও খেলেননি গাভাসকার। যা তাঁর জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংসও বটে।

এই যে মনে মনে নিজের রিভিউ, এটা করার জন্য দরকার হয় ভিন্ন ধরনের একটা সংকল্প।

তিন

‘সংকল্প’ মানে, আমার মন এই মুহূর্তে যা করতে টেম্পটেড হয়ে উঠছে, সেইটা দূরে সরিয়ে, আমার মূল গন্তব্য কী, সেটা মনকে বারবার স্মরণ করানো। যেমন জীবনের প্রথম টেস্ট শতরান, বিদেশে, এবং তার জন্য ৯ ঘণ্টা উইকেটে দাঁড়িয়ে থাকা। যেমন ছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। কারণ, জীবনের প্রথম টেস্টেই সেঞ্চুরিটা (৯৫ রানে আউট) মাঠে ফেলে এসেছিলেন যে!

ভুল হল। কেবল নিজের সেঞ্চুরির জন্য নয়। এই সেঞ্চুরিটা আমার দলের কাজে লাগবে — সেই কথা মনে করে একটা মানুষ উইকেটে ঝুরি নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এই দাঁড়িয়ে থাকাটা কেমন? কখনও সাড়ে ১০ ঘণ্টা। ৬২৯ মিনিট আক্ষরিক ভাবে বললে। নিজের রান ২১৭। কখনও ৬ মিনিট কম ১০ ঘণ্টা। নিজের রান ২৩৩। ৭ ঘণ?টা ১৬ মিনিট-এ কখনও ১৪৪। ৭ ঘণ্টা ৯ মিনিটে ১৪৮। ককনও ৮ ঘণ্টা ১০ মিনিটে ১৯০। এই ৮ ঘণ্টা কাটানোর দ্বিতীয় ইনিংসেই কিন্তু ১৩৬ বলে ১০৩ নট আউট। আড়াই ঘণ্টার একটু বেশি সময়েই সেঞ্চুরি।

১২ ঘণ্টা ২০ মিনিটও উইকেটে কাটিয়েছেন তিনি। ৭৪০ মিনিট। এই হলেন রাহুল দ্রাবিড়। হাটন তাঁর ৩৬৪ করতে ৭৯৭ মিনিট উইকেটে ছিলেন।

দ্রাবিড়ের ভারতীয় পূর্বসূরি এক্ষেত্রে একজনই। ধারাবাহিকতার দৃষ্টান্ত সেই একজন ছাড়া কই! গাভাসকার। ১৪ বছর টেস্ট খেলা হয়ে গিয়েছে, দু’বছর পর রিটায়ার করবেন। এই অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৫৫১ মিনিট উইকেটে। ১৬৬ রান। এটা ’৮৫র ডিসেম্বরে। জানুয়ারিতেই আবার ৫১৩ মিনিট উইকেটে। রান ১৭২। তার কয়েক বছর আগে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৭০৮ মিনিটে ১৭২। প্রায় সেই সময়েই পাকিস্তানের সঙ্গে ৭ মিনিট কম ১০ ঘণ্টা ক্রিজে। ১৬৬। এই হলেন গাভাসকার। রাহুল দ্রাবিড়ের আগে এই শান্ত, অবিচলিত ধৈর্য ধারাবাহিকভাবে মাত্র একজন ভারতীয়ের ভিতরেই ছিল। গাভাসকারের এই শতরানগুলির ইতিহাস ধরা আছে অশোক দাশগুপ্ত লিখিত ‘সানির ৩৪’ নামক বইতে। আমি কি মনে রাখছি না ১৯৫৯-৬০ সিরিজে জয়সীমার কথা, যিনি সে সিরিজের একটি টেস্টের পাঁচদিনই কখনও-না-কখনও ক্রিজে ছিলেন? এরকম বিক্ষিপ্ত উদাহরণের অভাব নেই। কিন্তু অভাব আছে ধারাবাহিকতার।

রাহুল দ্রাবিড়কে কেবল শতরান-দ্বিশতরানের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যত্রও আমরা ধৈর্যের প্রয়োগ ঘটাতে দেখব। ৬ ঘণ্টা ১২ মিনিটে ৭৮ কিংবা ২৬৮ মিনিটে ৫৭, ২৪৯ মিনিটে ৪৯। এর মানে হচ্ছে, আমি উইকেট ছেড়ে যাব না। আমি উইকেটে থাকতে এসেছি। উইকেট ছুড়ে দিতে নয়। আমি আমার দেশের হয়ে খেলতে নামলাম। আমি থাকব উইকেটে। রান হল, ভাল। রান-না-পাই, চেষ্টা করে যাব। কখনও সুযোগ আসবে। নিজেকে ছেড়ে দেব না নিজের ভিতর থেকে বারংবার জেগে উঠতে চাওয়া ইমপালস-এর হাতে। এই, নিজের ওপর এই নিয়ন্ত্রণটাই ‘সংকল্প’। এই ‘সংকল্প’ নিজের ওপর জারি রেখেছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। সেই জন্যই রাহুল দ্রাবিড় বলতে পেরেছিলেন এই কথা, ‘…টু মি, ক্রিকেট ইজ অ্যাবাউট ডিসকভারিং মাইসেলফ… লার্নিং ফ্রম সেটব্যাকস… অ্যান্ড ইমার্জিং আ বেটার ক্রিকেটার অ্যান্ড পার্সন।’

লক্ষ করুন, শুধু একজন ‘বেটার ক্রিকেটার’ পর্যন্তই কিন্তু বলেননি রাহুল দ্রাবিড়। বলছেন, ‘ইমার্জিং আ বেটার ক্রিকেটার অ্যান্ড পার্সন।’ অর্থাৎ একজন মানুষ হিসেবেও তিনি ক্রমশ উন্নততর হয়ে উঠতে চান, কারণ, ক্রিকেট রাহুল দ্রাবিড়ের কাছে কী? ‘টু মি, ক্রিকেট ইজ অ্যাবাউট ডিসকভারিং মাইসেলফ।’ ক্রিকেট তাঁর কাছে আত্ম-আবিষ্কারের পথ।

আর এখানে এসেই কবিতালেখকের সঙ্গে, তাঁর মন, তাঁর সংকল্পের একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কেননা, কবি ও লেখক, আত্মআবিষ্কার করতে চান। লেখার মধ্যে দিয়ে দিনে-দিনে নিজের জীবনের ‘সেটব্যাকস’ বা ভুলগুলোর থেকে শিক্ষা নিতে চান। এবং ক্রমশ একজন উন্নততর লেখক শুধু নয়, উন্নততর মানুষ হয়ে উঠতে চান। অধিকতর খ্যাতিসম্পন্ন লেখক মানেই আমাদের কাছে উন্নততর লেখক। সেটা নয় আসলে। খ্যাতিলাভের সঙ্গে রচনার উন্নতির সম্পর্ক কিছু দূর পর্যন্ত মাত্র। তারপরই পুরো পথটা একা চলতে হয় লেখককে।

যে-ক্রিকেটার খেলার মধ্যে দিয়ে উন্নততর মানুষ হয়ে উঠতে চান, সেই চাওয়াটার প্রমাণ ও পরীক্ষা কিন্তু দিয়ে যেতে হয় কেবল নিজের কাছে। বাইরের মানুষ এই পরীক্ষা নিতে পারবে না। কারণ তারা নানা রকম বাইরের আলো ফেলে-ফেলে তার বিচার করবে। সেই বারিরে আলোকে বাইরেই রাখতে চান রাহুল দ্রাবিড়। সেইজন্যই ভিতর দিকে তিনিও একা। সেই জন্যই তিনি বলেছেন, দর্শক বা সাংবাদিকরা তাঁকে ‘দ্য ওয়াল’ অভিধা দিলেও, তিনি সেটা অন্তরে গ্রহণ করেননি। সেই অভিধাকে অসম্মান করছেন না, রাহুল দ্রাবিড়, মানুষের ভালবাসাকে স্বীকার করছেন, কিন্তু ব্যাট করতে যখন যাচ্ছেন — তখন মনে রাখছেন না এই অভিধাটি তাঁর সম্পর্কে প্রয়োগ করা হয়। অর্থাৎ এই ‘দ্য ওয়াল’ নামক যে সম্মান তাঁকে দেওয়া হয়, সেই সম্মানকে রাহুল দ্রাবিড় কেবল ওষ্ট পর্যন্ত তুলে আনেন। পান করেন না। কারণ তিনি যে বলেছেন, তাঁর মূল লক্ষ্য ক্রিকেটার ও মানুষ হিসেবে আরও উন্নততর হয়ে ওঠা।

সুনীল গাভাসকার যেমন বিগ হান্ড্রেড বা ডাবল হান্ড্রেডগুলোর পর ফিরে এসে মনে-মনে, একা-একা প্রতিটি বল কীভাবে খেলেছেন মাঠে পুনর্বার ফিরে দেখতেন — রাহুল দ্রাবিড়ও নিজের রিভিউ নিজে করতেন, সেটা বোঝা যায়। ৩১ হাজার ১৮৯টি বল তিনি খেলেছেন টেস্টে, যা আর কোনও ব্যাটসম্যান খেলেননি। ৭৩৫ ঘণ্টা ২১ মিনিট তিনি ক্রিজে কাটিয়েছেন। এই সবই রাহুল দ্রাবিড়ের সংকল্পের প্রমাণ। যে সংকল্পর লক্ষ্য আত্মআবিষ্কার।

চার

এইটিই হল সেই ‘মন’! গন্তব্যে পৌঁছনোর সেই লক্ষ্য! যে-মন, যে-গন্তব্য, রাহুল দ্রাবিড়ের অবসর গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গি অবসর নিল ভারতীয় ক্রিকেট থেকেও। রাহুল যে বরাবরের বিনয়ী, সৌজন্যময়, মৃদুভাষী মানুষ এর সেটা যে তাঁর দুর্বলতা নয়, স্বেচ্ছা-নির্বাচিত ব্যবহার, সেটাই যে তাঁর ব্যক্তিত্ব — সেকথা আজ সবার কাছে পরিষ্কার। তিনি যে আরও অন্তত একটা সিরিজ, ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলে তাঁর অস্ট্রেলীয় সফরের ব্যর্থতা কাটিয়ে অবসর নিতে পারতেন, সে-কথাও অল্পবিস্তর সকলেই জানেন। কিন্তু তিনি নিজের ‘মন’-কেই প্রাধান্য দিলেন। বাইরের যশ-খ্যাতি-প্রতিপত্তিকে নয়। অপর লোকের কাছে, মিডিয়ার কাছে, নির্বাচকদের কাছে কিছু প্রমাণ করে দেখানোকে তিনি গুরুত্ব দিলেন না। আর এই মনোভঙ্গিটাই ভবিষ্যতের ভারতীয় ক্রিকেটে আর ফিরে আসবে না।

সফল হলাম। তারপর রিটায়ার করলাম। এটাও একরকম লোককে দেখানো। যে মনে করে, ‘টু মি, ক্রিকেট ইজ অ্যাবাউট ডিসকভারিং মাইসেলফ’ — তার কাছে নিজে কী দেখতে পাচ্ছি নিজের মনের ভিতর তাকিয়ে, সেটাই বড়। এটা এক ধরনের বিনয়। এক ধরনের আত্মনিবেদন। ক্রিকেট নামক মহান খেলাটির কাছে তথা নিজের অন্তরাত্মার কাছ। অন্যরা আমার দিকে তাকিয়ে কী দেখছে, কতটা সফল হয়েছে — সেটা বড় নয়। এখানেও রাহুল দ্রাবিড়ের মন সত্যিকারের কবির মন-এর সঙ্গে মিলে যায়।

ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা উইকেটে কাটাতে কেউ রাজি নয় আর। কারণ, কে দেখবে সে-জিনিস। কেউ না, কেউ না। কে সেখানে টাকা ঢালবে। কেউ না। টিটোয়েন্টি এসে গিয়েছে। এসেছে টাকার পর টাকা। আরও আক্রমণাত্মক, আরও আরও আক্রমণাত্মক হও, অবিরল এই মন্ত্র চতুর্দিক থেকে কানে আসছে। দিকে-দিকে শুধু প্রতিযোগিতার সর্বগ্রাসী মন তৈরি হয়ে উঠছে। স্কুল-বালকরাও এর বাইরে নয়। তাই বাৎসরিক পরীক্ষায় খারাপ ফল কলেই ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার সংবাদ কানে আসছে আমাদের প্রতি বছর। আমি যে ক্রিকেট-যুগের কথা বলছি, সে-সময়ে কি স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেই এত আত্মহত্যা করত? না, সে-সময়টা ছিল আলাদা। সেই আলাদা সময়ের একটা ‘মন’ ছিল। সেই ‘মন’ কোনও কোনও ক্রিকেটারের মধ্যেও প্রবেশ করেছিল। এ কথা আমি ভুলে যাচ্ছি না, মানুষের গভীরে সুপ্ত থাকা আক্রমণের স্পৃহা ক্রীড়াক্ষেত্রে চিরকাল ব্যবহৃত হয়েছে। লারউড-জার্ডিনের সময়ে হয়েছে। লিন্ডওয়াল-মিলার-এর সময়ে হয়েছে। এই ধারাতেই এসেছেন হল-গিলক্রিস্ট। লিলি-টমসন। এই কারণেই ফ্রেডি ট্রুম্যানকে বলা হত ফায়ারি ফ্রেডি। ’৭০-এর দশকে লয়েড-এর চার পেসব্যাটারি এই ধারাতেই এসেছে। এসবই সত্য। তবু শেষ সত্য নয়। অন্তত রাহুল দ্রাবিড়ের মতো কারও কারও কাছে।

ট্রুম্যানের ৬৭ টেস্টে ৩০৭ উইকেটের সামনে এসে যখন দাঁড়ালেন ল্যান্স গিবস, তখন আমরা কত হাসাহাসি করেছি। পরপর টেস্ট খেলিয়ে যাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড গিবসকে দিয়ে রেকর্ডটা ভাঙার জন্য। ৩০৫ উইকেট থেকে আর উঠতে পারছেন না গিবস। শুয়েই আছেন। শেষে ৩০৯ উইকেট নিয়ে রিটায়ার করে বাঁচলেন। আমরাও বাঁচলাম। রাহুল দ্রাবিড় সেরকম কোনও রাস্তায় হাঁটেননি। ভারতের ভবিষ্যৎ ক্রিকেট খেলোয়াড়রা টাকা, অনডোর্সমেন্ট, স্পনসর আর আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে বড় হয়ে উঠবে। সমাজের সর্বস্তরে যে-মনোভঙ্গি ছড়িয়ে আছে, সেই মন-কেই তারা গ্রহণ করবে। তাদের পরিবার গ্রহণ করতে শেখাবে সেই মনোভঙ্গিকেই। অ্যাগ্রেসিভ হতে পারাই আসল বেঁচে থাকার রসদ। পাঁচদিনের ক্রিকেট ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যাওয়ার পথে এগোবে।

রাহুল দ্রাবিড়ের শেষ ইনিংসটাও আমি দেখেছি। ৯৫ মিনিটে ২৫। ভাল ইনিংস নয়। কিছু এসে যায় না। কারণ সেই প্রতিজ্ঞার স্ফূরণ, একনাগাড়ে লেগে থাকার সেই চেষ্টাটা তিনি তখনও ছাড়ছিলেন না। পারেননি, কী করা যাবে। ভাগ্যবান মনে করি নিজেকে, অত বড় একজন ব্যাটসম্যানের শেষ ইনিংসটাও দেখেছি বলে। সেই সঙ্গে মনে পড়ছে, তাঁর সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটিও আমি টিভিতে দেখেছিলাম। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। নিজের প্রকৃতিবিরুদ্ধে একটা শট নিলেন দ্রাবিড়। রিভার্স সুইপ। বোল্ড হলেন। ৩০০ রান থেকে তখন তিনি মাত্র ৩০ রান দূরে। দু-এক ওভার আগে থেকেই ওইরকম মরিয়া হয়ে ব্যাট চালাতে শুরু করেছিলেন হঠাৎ। তার আগেই একটা জলপানের বিরতি হয়ে গিয়েছে। বিরতির পরই দ্রাবিড়ের ব্যাটিং কীরকম মরিয়া ও অন্যমনস্ক হয়ে গেল। ৭৪০ মিনিটের ইনিংসটি যখন শেষ হল, তার আগেই কেমন করে সব এলোমেলো হয়ে গেল হঠাৎ।

রাহুল যখন বোল্ড হলেন, তখন তাঁর মুখে কোনও হতাশা বা বিস্ময় ছিল না। ছিল অসম্ভব এক উদাসীনতা। অত বড় ইনিংস। ফলে চতুর্দিকে হাততালি। বারবার রিপ্লে দেখানোও চলছে। আমিও বারবার মুখটা নজর করার সুযোগ পেলাম। কিছুতেই-কিছু-এসে-যায়-না-ধরনের নির্বিকার ঔদাস্য। কেন? এর কারণ কী? জানি না। ওইভাবে উইকেট প্রায় থ্রো করতেও দ্রাবিড়কে কখনও দেখিনি। সেখানে কি কোনওরকমে ব্যাট সরিয়ে নেওয়া ছিল? মানে, নিজেকে স্বেচ্ছায় সরিয়ে নেওয়া? কোনও নির্দেশ এসেছিল প্যাভিলিয়ন থেকে? মনে পড়ছে ‘রানস অ্যান্ড রুইনস’ বইতে গাভাসকার জানাচ্ছেন সেই ইনিংসের বিষয়ে একটা কথা, যে-ইনিংসে তিনি ১০ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ক্রিজে থেকে অপরাজিত ২৩৬ করেছিলেন। সানি লিখছেন, ‘আমি যখন ৩০০ রানের জন্য ভাবছি, ড্রেসিংরুমে কপিল জানাল, সে ভাবছে ইনিংস ডিক্লেয়ারের কথা।’ গাভাসকার, ভিনু মানকড়ের ২৩১ রানের রেকর্ড পেরিয়ে যাওয়ার পরেই ডিক্লেয়ারেশন  আসে সি ইনিংসের। এখানেও তেমন কিছু ঘটেছিল কি? আমি জানি না।

কিন্তু রাহুল দ্রাবিড় জানেন, সারাজীবন ধরেই জানেন — ব্যাট দিয়ে বলকে খেলাটাই একমাত্র খেলা নয়। বল থেকে ব্যাট সরিয়ে নিতে পারাটাও খেলা। নিজেকে সরিয়ে নিতে যে জানে, সে জানে পুরো খেলাটার মানে। রাহুল দ্রাবিড় জানেন।

পুনশ্চ – রাহুল দ্রাবিড় অবসর নেওয়ার বছরেই এই লেখাটি তৈরি করেছিলাম। তারপর বেশ কয়েক বছর পার হয়েছে। এখন রাহুল দ্রাবিড় আবার সংবাদের শিরোনামে। তিনি ভারতীয় দলের কোচ নিযুক্ত হয়েছেন। যোগ্যতম ব্যক্তি সংশয় নেই। এই কোচ নিশ্চয়ই তাঁর ক্যাপ্টেনকে বলবেন না ৪১৩টি টেস্ট উইকেট নেওয়া ও ৫টি টেস্ট শতরানের অধিকারী কোনও ক্রিকেটারকে ম্যাচের পর ম্যাচ মাঠের বাইরে বসিয়ে রাখতে। রাহুল দ্রাবিড়ের কাছে নিশ্চয়ই আমরা সুবিচার পাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.