সুমিত মুখার্জি / লেফট-আর্ম ওভার

তিন রকমের তিনটে ডেলিভারি। প্রতিটিই আগের চেয়ে বিপজ্জনক। নিখুঁত, যথাযথ এই তিনটে বলই ২০২১ টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপে ডেকে এনেছিল ভারতের পতন। আর ওই চার ওভার শাহিন শাহি আফ্রিদিকে দিয়েছিল পাকিস্তানি জোরে বোলারদের মধ্যে নেতার মর্যাদা। ছ’ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার শাহিনের শিশুসুলভ মুখ দেখে  ভুল করবেন না। খুবই জোরে বল করেন এবং শুরুর স্পেলে নতুন সাদা বল পর্যাপ্তেরও বেশি সুইং করাতে সিদ্ধহস্ত এই পাক যুবক।

প্রথম বলটা ইয়র্কার। দেরিতে ভাঙল। রোহিত শর্মার পা পেয়ে গেল স্টাম্পের সামনে। ভারতীয় ইনিংসের সেটাই প্রথম ওভার, টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপে এবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গ্রুপের প্রথম ম্যাচে। দ্বিতীয় ওভারে বাঁহাতি পেসারের হাত থেকে বেরল আরও একটা স্বপ্নের বল। এবারও ভাঙল দেরিতে। কেএল রাহুলের অনিশ্চিত ফুটওয়ার্ক এবং ব্যাটের নাগাল এড়িয়ে আছড়ে পড়ল স্টাম্পে। ভারত আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অধিনায়ক বিরাট কোহলি চেষ্টা করছিলেন মোটামুটি সম্মানজনক রানে দলকে পৌঁছে দিতে। তখনই ফিরে এলেন শাহিন আবার। কোহলিকে অবাক করে দিলেন শর্টপিচ বলে যা লাফাল কোহলির প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। তাই কোহলির ব্যাটের ছোঁয়া নিয়ে বল আশ্রয় নিল পাক উইকেটরক্ষকের গ্লাভসে।

২০ ওভারের বিশ্বকাপে প্রথমবার ভারতকে হারাল পাকিস্তান, শাহিনের ওই তিনটে বলের সৌজন্যে। এর আগে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপেও কখনও ভারতকে হারাতে পারেনি পাকিস্তান। তাই সব ধরনের বিশ্বকাপেই ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রথম জয় এল বাঁহাতি পেসার শাহিনের হাত ধরে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, ওই তিনটে বল যেন আঘাত করেছিল ভারতীয়দের আত্মবিশ্বাসে, সরাসরি। তাই তুলনায় অল্প রান হাতে নিয়ে বল করতে নেমেও ভারতীয়দের দেখে মনে হচ্ছিল, ওই আঘাত সামলে উঠতে পারেননি কেউই।

শাহিনের তিন উইকেট আর পাকিস্তানি ওপেনার বাবর আজম ও মহম্মদ রিজওয়ানের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ভারতীয়দের এতটাই বেলাইন করে দিয়েছিল যে, সাত দিনের বিশ্রামেও নিজেদের মেরামত করে উঠে দাঁড়ানোর রাস্তা খুঁজে পায়নি রবি শাস্ত্রীর কোচিং। দশ উইকেটে পাকিস্তানের কাছে হারের পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধেও ওই একই অসহায় আত্মসমর্পণের কাহিনী। ওই ম্যাচেও ঘাতকের ভূমিকায় আরও একজন বাঁহাতি পেসার — ট্রেন্ট বোল্ট। কিউই পেসারকে অবশ্য যথাযোগ্য সাহায্য করেছিলেন দলের স্পিনাররাও।

মানতেই হবে, শাহিনের মতো বিপজ্জনক ছিলেন না বোল্ট। কিন্তু চাতুর্য এবং বৈচিত্র্যের কারণে সাম্প্রতিক কালে বোল্ট বরাবরই কার্যকরী ভূমিকায় থেকেছেন নিউজিল্যান্ড দলে। সেখানে গতিময় ও ভয়ঙ্কর শাহিন নিশ্চিতভাবেই নিজের নাম লিখে ফেললেন সোনার অক্ষরে, ভারত-পাক ক্রিকেট-বিরোধিতার ইতিহাসে।

শারজায় চেতন শর্মার শেষ বলে ছয় মেরে জাভেদ মিয়াঁদাদ ১৯৮৫ সালে নতুন ইতিহাস লিখেছিলেন ভারতের বিরুদ্ধে। বহুদিন সময় নিয়েছিল ভারত, সেই ধাক্কা সামলে উঠতে। শাহিনের এই আঘাত থেকে সেরে উঠতে কত দিন সময় নেয় ভারত, দেখার বিষয়। তবে তার আগে জরুরি এই বিশেষ প্রতিভার বোলিং উপভোগ করা, প্রায় প্রতি ম্যাচেই যিনি পাকিস্তানকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন বল হাতে।

সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধেও শুরুর স্পেলে খেলা যাচ্ছিল না শাহিনকে। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ পড়তে পারেননি শাহিনের সুইং। তাঁর পা উইকেটের সামনে পেয়ে গিয়েছিল শাহিনের বল। মিচেল মার্শেরও একই অবস্থা হচ্ছিল, ‘আম্পায়ার্স কল’ তাঁকে বাঁচিয়ে দেয় ডিআরএস-এ। শেষ ওভারে আবার ম্যাথু ওয়েডের পরপর তিনটে ছয় শাহিনকে নামিয়ে আনে মাটিতে। কিন্তু মনে রাখা জরুরি, ঠিক তার আগের বলেই হাসান আলির সহজ ক্যাচ মিসও।

চাপের মুখে শাহিন লেংথ ধরে রাখতে পারেননি। আর সবাই-ই জানেন, ক্রিকেট খেলাটাই দাঁড়িয়ে আছে এই ছোট ছোট ভুলগুলোর ওপর। ওয়েডকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। অনায়াস ঔদ্ধত্যে বিপক্ষের সেরা জোরে বোলারকেই আক্রমণের জন্য বেছে নিয়ে অসমসাহসী জয় এনে দেওয়ার জন্য। এই দ্বৈরথও ভোলা যাবে না।

ক্রিকেটে বাঁহাতি পেসাররা একেবারে অন্য প্রজাতি। অ্যালান ডেভিডসন থেকে গ্যারি সোবার্স, গ্যারি গিলমোর থেকে চামিন্ডা বাস, মিচেল জনসন থেকে জাহির খান, মিচেল স্টার্ক থেকে মহম্মদ আমির — বাঁহাতি পেসাররা যুগে যুগে নিজেদের দলকে নির্ভরতা দেওয়ার পাশাপাশি ক্রিকেটপ্রেমীদের দিয়ে গিয়েছেন নিখাদ আনন্দ। ক্রিকেট ইতিহাসে রেখে গিয়েছেন নিজেদের জন্য আলাদা জায়গা। বাঁহাতি জোরে বোলাররা যে কোণটা তৈরি করেন, ডানহাতি ব্যাটারদের কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়। লেংথ, লাইন আগে থেকেই বুঝে নেওয়ার কাজে দেরি হয়ে যায় বলে খেলাটা আরও শক্ত তখন। বিশেষ করে শাহিনের সঙ্গে যদি ওয়াসিম আক্রামের কথাও মনে পড়ে, দুজনের ওভার দ্য উইকেট বোলিং সামলানো ডানহাতি ব্যাটারদের কাছে বিভীষিকার মতোই।

‘পরের আক্রাম’ বলার প্ররোচনা বিরাট। কিন্তু এখনই শাহিনের নামের পাশে ওই তকমা জুড়ে দেওয়াটা বড্ড তাড়াতাড়ি এবং অপরিণত মানসিকতার প্রমাণ হয়ে থাকবে। তাই ও-পথ পরিহার্য। শাহিন এখন উন্নতির রাস্তায়। সব অস্ত্র তুলে আনতে পারেননি তূণে। চেষ্টা করছেন, অচিরেই পৌঁছবেন সেখানে, আশায় দোষ নেই। সহজাত প্রতিভা এবং দক্ষতায় কিংবদন্তি আক্রামের কাছাকাছিই থাকবেন, নিঃসন্দেহ। যে দুটো জায়গায় শাহিন এগিয়ে — গতি আর শারীরিক উচ্চতা। ফলে, আরও বিপদে ফেলবেন ব্যাটারদের ভবিষ্যতে। নতুন নতুন অস্ত্রও তুলে নিলে ক্রিকেট ইতিহাসও নতুন করে ভাবতে বাধ্য হবে তাঁকে নিয়ে।

অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্কের মতো শরীর নয় শাহিনের। কিন্তু দুজনের বলই ধেয়ে আসে যথেষ্ট দ্রুত, ঘণ্টায় ১৪৫ কিলোমিটারের বেশি বেগে। নতুন বলে, সে লাল হোক বা সাদা, সুইং করাতে পারেন দুজনই দু’দিকে, আর আছে সেই বিপজ্জনক ইয়র্কার যা তাঁদের হাত থেকে বেরয় নির্ভুল নিশানায়। স্টার্কের বয়স ৩১। শাহিনের চেয়ে ঠিক দশ বছরের বড়। সুতরাং, শাহিন যে আরও বহু রেকর্ড গড়বেন, নিশ্চয়তা দেওয়াই যায়। চোটমুক্ত থাকতে হবে শুধু, আর ধরে রাখতে হবে লক্ষ্যটা, চোখের সামনে, নিজের সামনে। এমন দুর্লভ প্রতিভা যাঁর, সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসাবে নিজেকে তুলে ধরাও এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.